
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে সরকারি ক্রোড়পত্র বরাদ্দে অনিয়ম ও কমিশণ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) শীর্ষ পর্যায়ের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, অখ্যাত ও অনিয়মিত পত্রিকাকে বরাদ্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পত্রিকাপ্রতি দেড় লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ডিএফপির মহাপরিচালক খালেদা বেগম।
সরকারি ক্রোড়পত্র বরাদ্দে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ঘিরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) শীর্ষ পর্যায়ে। অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত প্রকাশনা ও পাঠকপ্রিয়তা না থাকা বিভিন্ন পত্রিকাকে সরকারি পূর্ণ পৃষ্ঠার রঙিন ক্রোড়পত্র পাইয়ে দিতে একটি প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগী চক্র সক্রিয় ছিল। এই চক্রের মাধ্যমে প্রতিটি পত্রিকার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকাশক ও সংবাদকর্মীরা।
৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালন উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জারি করা ক্রোড়পত্রের তালিকা পর্যালোচনা এবং একাধিক প্রকাশক ও সংবাদকর্মীর সঙ্গে কথা বলে এসব অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের ৮৪টি এবং ঢাকার বাইরের ৭৬টিসহ মোট ১৬০টি পত্রিকাকে এক পূর্ণ পৃষ্ঠার চার রঙের সরকারি ক্রোড়পত্র প্রকাশের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের নির্ধারিত সরকারি বিজ্ঞাপনের রেট কার্ড অনুসারে প্রতিটি পত্রিকাকে প্রথম শ্রেণির বিল পরিশোধ করা হবে। এতে প্রচারসংখ্যা নির্বিশেষে বিল ছাড় হলে প্রতিটি পত্রিকা সরকারি কোষাগার থেকে আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত পেতে পারে।
**দেড় লাখ টাকা কমিশনের অভিযোগ**
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রোড়পত্রের তালিকা চূড়ান্ত করার সময় ডিএফপির মহাপরিচালকের দপ্তরকে কেন্দ্র করে একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিছু অসাধু প্রকাশকের সহযোগিতায় চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন পত্রিকার মালিক ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বরাদ্দের বিষয়ে দরদাম চূড়ান্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একটি পূর্ণ পৃষ্ঠার ক্রোড়পত্রের বিপরীতে সরকারি বিল থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা ডিএফপির মহাপরিচালকের ‘অফিস খরচ ও অনুমোদন ফি’ হিসেবে মধ্যস্থতাকারীদের হাতে দিতে বলা হয়। এই অর্থ অগ্রিম অথবা বিল পাওয়ার নিশ্চয়তার বিপরীতে নেওয়া হতো বলে দাবি করা হয়েছে। বাকি অর্থ পত্রিকার মালিকদের কাছে থেকে যেত।
রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি স্বল্পপ্রচারিত দৈনিকের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডিএফপির মহাপরিচালকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারীরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে দেড় লাখ টাকা দেওয়ার শর্ত জানানো হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
ওই প্রকাশকের ভাষ্য, যারা টাকা দিতে রাজি হয়েছেন, তাদের পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশনা থাকুক বা না থাকুক, তালিকায় নাম উঠেছে। অন্যদিকে, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানো নিয়মিত প্রকাশিত পত্রিকাও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
ঢাকার বাইরের একজন স্থানীয় সম্পাদকও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রকাশিত অনেক পত্রিকাকে বাদ দিয়ে এমন কিছু পত্রিকাকে ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর পরিচিতি স্থানীয় পর্যায়েও নেই। তাঁর দাবি, মূলত দেড় লাখ টাকার লেনদেনের মাধ্যমে এসব বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।
**তালিকায় ৮০টির বেশি কাগুজে পত্রিকা থাকার অভিযোগ**
ক্রোড়পত্রের তালিকায় মূলধারার জাতীয় দৈনিক যুগান্তর, দিনকাল, আমার দেশ, সমকাল ও কালবেলার পাশাপাশি ঢাকা ডায়ালগ, রূপালী দেশ, লাখোকণ্ঠ, ভোরের সংলাপ, আজকের আওয়াজ, স্বদেশ প্রতিদিন, ঐশী বাংলা, সমাবেশ ও খোলা বাজারের মতো বিভিন্ন পত্রিকার নাম রয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তালিকাভুক্ত এসব পত্রিকার বড় অংশের নিজস্ব ছাপাখানা, নিয়মিত সাংবাদিক ও কর্মচারী নেই। এমনকি অনেক পত্রিকা সাধারণত সংবাদপত্রের বাজারেও পাওয়া যায় না।
অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তত ৮০ থেকে ৯০টি পত্রিকার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। এতে কমিশন বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় সোয়া কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
**স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন**
সরকারি বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র বরাদ্দের নীতিমালা অনুযায়ী, ডিএফপির নিয়মিত প্রচারসংখ্যা নিরীক্ষা এবং কার্যকর সার্কুলেশন যাচাই করে পত্রিকার শ্রেণি নির্ধারণের পর বিজ্ঞাপন বিল ছাড় করার কথা।
কিন্তু প্রয়োজনীয় নিরীক্ষা ও যাচাই ছাড়াই রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দের অভিযোগ উঠেছে। সুশাসন ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে ক্রোড়পত্র বণ্টনে আগের অনিয়ম ও দুর্নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তাঁরা মনে করেন, জনগণের করের অর্থ এভাবে অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
**অভিযোগ অস্বীকার ডিএফপির মহাপরিচালকের**
তবে ক্রোড়পত্র বরাদ্দে দেড় লাখ টাকা কমিশন নেওয়া এবং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ডিএফপির বর্তমান মহাপরিচালক খালেদা বেগম।
তিনি বলেন, দেড় লাখ টাকা নিয়ে ক্রোড়পত্র দেওয়ার তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর দপ্তর বা তিনি কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত নন। প্রচলিত সরকারি নীতিমালা এবং মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া তালিকাভুক্তির কাগজপত্রের নিয়ম অনুসরণ করেই ক্রোড়পত্র বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খালেদা বেগম আরও বলেন, বাইরে কেউ সিন্ডিকেটের কথা বলে টাকা চেয়ে থাকলে কিংবা বদনাম ছড়িয়ে থাকলে তার দায় ডিএফপির নয়।
তিনি জানান, বরাদ্দসংক্রান্ত চিঠির শর্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিয়মিত ও বৈধ প্রকাশনা না থাকলে কোনো পত্রিকাকে বিল দেওয়া হবে না। বিল অনুমোদনের আগে প্রতিটি পত্রিকার মুদ্রিত কপি ও প্রচারসংখ্যা যাচাই করা হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার বিল ছাড় করা হবে না।