বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার নামকরণের পেছনে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনা, কিংবদন্তি, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের স্মৃতি। কোনো জেলার নাম এসেছে প্রাচীন রাজা-জমিদারের নাম থেকে, কোনোটি পেয়েছে সুফি সাধক বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের পরিচয়ে, আবার কোনো জেলার নামকরণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নদী, খাল ও স্থানীয় জনপদের ইতিহাস। মহকুমা থেকে জেলা গঠনের প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও বর্তমান বাংলাদেশের জেলা কাঠামো গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এসব জেলার নামকরণের পেছনে যেমন রয়েছে প্রাচীন জনপদ ও রাজা-বাদশাহদের স্মৃতি, তেমনি রয়েছে নদ-নদী, ভূপ্রকৃতি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, জমিদার এবং ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রভাব। সময়ের পরিবর্তনে অনেক এলাকার নাম বদলেছে। কোনো কোনো নামের উৎপত্তি নিয়ে আবার রয়েছে একাধিক মত ও প্রচলিত কিংবদন্তি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জেলার পূর্বনাম, নামকরণের ইতিহাস এবং বর্তমান জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো।
ঢাকা বিভাগ ও আশপাশের জেলার নামকরণের ইতিহাস
ঢাকা:
মুঘল আমলে ১৬১০ সালে সুবাদার ইসলাম খান বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে তখন ঢাকার নাম রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’। পরবর্তী সময়ে ঢাকা নামটি আবার প্রচলিত হয়। এ ছাড়া প্রচলিত একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, রাজা বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এলাকায় দেবী দুর্গার বিগ্রহ আবিষ্কার করেন এবং সেখানে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এই মন্দিরের নাম থেকেই ঢাকা নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
গাজীপুর:
গাজীপুরের প্রাচীন পরিচিতি ছিল ভাওয়াল নামে। পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের একটি অংশ জয়দেবপুর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ভাওয়ালের জমিদার জয়দেব নারায়ণ রায় চৌধুরীর নামানুসারে জয়দেবপুর নামের উৎপত্তি বলে জানা যায়। অন্যদিকে গাজী ফজল গাজীর নামের সঙ্গে গাজীপুর নামের উৎপত্তির সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রচলিত মত রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ:
অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে বর্তমান কিশোরগঞ্জ অঞ্চল কাটখালী নামে পরিচিত ছিল। জমিদার ব্রজকিশোর বা নন্দকিশোর প্রামাণিকের নাম এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত গঞ্জের পরিচয় থেকে কিশোরগঞ্জ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
মাদারীপুর:
মাদারীপুরের প্রাচীন নাম ছিল ইদিলপুর। পঞ্চদশ শতাব্দীর সুফি সাধক হযরত বদরুদ্দিন শাহমাদার (র.)-এর নামের সঙ্গে এ অঞ্চলের বর্তমান নামের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর নামানুসারেই মাদারীপুর নামের প্রচলন ঘটে।
গোপালগঞ্জ:
বর্তমান গোপালগঞ্জ অঞ্চল একসময় রাজগঞ্জ নামে পরিচিত ছিল। মাকিমপুর স্টেটের জমিদার রানী রাসমণির সঙ্গে এ অঞ্চলের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর নাতি নব-গোপালের নামের সঙ্গে রাজগঞ্জের গঞ্জ শব্দ যুক্ত করে গোপালগঞ্জ নামকরণ করা হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের জেলার নামকরণের ইতিহাস
চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামের নামকরণের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীন আরব ও বাণিজ্যিক বিবরণে এ অঞ্চলকে শাতগাঁও বা চৈত্যগ্রাম নামে উল্লেখ করার কথা পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে চট্টল ও চট্টগ্রাম নামের প্রচলন ঘটে। মুঘল ও ব্রিটিশ আমল থেকেই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
কুমিল্লা:
কুমিল্লার প্রাচীন নাম ছিল রোশনাবাদ। এ অঞ্চলের নামকরণের সঙ্গে কমলাঙ্ক ও কমলাপুর নামেরও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়। সময়ের পরিবর্তনে এসব নাম থেকে কুমিল্লা নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামের উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা করা হয়, এ অঞ্চলে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের বসতি স্থাপনের সঙ্গে নামটির সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সামাজিক এবং জনবসতির ইতিহাসের মধ্য দিয়ে এলাকাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া নামে পরিচিতি লাভ করে।
নোয়াখালী:
নোয়াখালীর প্রাচীন নাম ছিল ভুয়াউয়া বা দক্ষিণ শাহবাজপুর। মেঘনা নদী ও সাগরের ভাঙন মোকাবিলায় এ অঞ্চলে একটি বড় খাল খনন করা হয়েছিল। স্থানীয় ভাষায় নতুন খালকে বলা হতো ‘নোয়া খালী’। সেই নাম থেকেই পরবর্তী সময়ে পুরো অঞ্চল নোয়াখালী নামে পরিচিতি লাভ করে।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের জেলার নামকরণের ইতিহাস
বগুড়া:
বগুড়া অঞ্চলের ইতিহাস প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমান বগুড়ার মহাস্থানগড় এলাকায় প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে। অন্যদিকে বগুড়া নামের উৎপত্তির সঙ্গে পাল বংশের রাজা বা স্থানীয় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮২১ সালে বগুড়া জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
রংপুর:
মুঘল আমলে এ অঞ্চল রংপুর সরকার নামে পরিচিত ছিল। রংপুর নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয় ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীন রাজা ভগদত্তের রত্নভাণ্ডার কিংবা রংকরের উপাসনাকেন্দ্রের সঙ্গে এ নামের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য নেই।
দিনাজপুর:
দিনাজপুর নামের উৎপত্তি স্থানীয় রাজা বা জমিদার দিনাজ কিংবা দিনারোজ রাজের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়। তাঁদের নাম থেকেই এ অঞ্চলের নাম দিনাজপুর হয়েছে বলে প্রচলিত রয়েছে।
লালমনিরহাট:
লালমনিরহাট নামের উৎপত্তি নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি মত রয়েছে। ১৭৮৩ সালের ব্রিটিশবিরোধী কৃষক বিদ্রোহের সময় লালমনি নামে এক কৃষক নেতার ভূমিকার সঙ্গে এ নামের সম্পর্কের কথা বলা হয়। তাঁর নামের সঙ্গে হাট শব্দ যুক্ত হয়ে লালমনিরহাট নামের সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রচলিত রয়েছে।
খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলার নামকরণের ইতিহাস
খুলনা:
খুলনা নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। কারও মতে, ভৈরব নদের তীরবর্তী কূল বা নদীতীরের পরিচয় থেকে এ নামের উৎপত্তি। আবার কারও মতে, খান জাহান আলীর সময়ের খোলাহাটি কিংবা স্থানীয় ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে নামটির সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮২ সালে খুলনা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।
যশোর:
যশোর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা। ১৭৮১ সালে এ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। যশোর নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। যশোরা বা যশের হর অর্থাৎ খ্যাতি ও বিজয়ের স্থানের সঙ্গে নামটির সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
বরিশাল:
বরিশালের প্রাচীন নাম ছিল বাকলা এবং পরবর্তী সময়ে চন্দ্রদ্বীপ নামে পরিচিতি লাভ করে। চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে এ জনপদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছিল। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ লবণ ব্যবসায়ী বাকের সাহেবের নামানুসারে বাকেরগঞ্জ নামের প্রচলন ঘটে। নদী ও খালবেষ্টিত এ অঞ্চলে বরিশাল নামটিও ক্রমে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের জেলার নামকরণের ইতিহাস
সিলেট:
সিলেটের প্রাচীন পরিচিতির সঙ্গে শ্রীভূমি ও জালালাবাদ নাম জড়িয়ে রয়েছে। মুঘল আমলে জালালাবাদ নামের ব্যবহার ছিল। হযরত শাহজালাল (র.) ও তাঁর সঙ্গীদের ইসলাম প্রচারের ইতিহাস এ অঞ্চলের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাহাড়-টিলাবেষ্টিত এ জনপদে সিলেট নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মত রয়েছে।
ময়মনসিংহ:
ময়মনসিংহের প্রাচীন নাম ছিল নাসিরাবাদ। মুঘল বা সুলতানি আমলের শাসক নছরত শাহের নামের সঙ্গে এ নামের উৎপত্তির সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর আমলে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ধারায় ময়মনসিংহ নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
৬৪ জেলা গঠনের ঐতিহাসিক পটভূমি
দেশভাগ ও পাকিস্তান আমল:
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় পূর্ববঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় বা বৃহত্তর জেলার সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ থেকে ১৬টি। পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক প্রয়োজন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নতুন জেলা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে টাঙ্গাইল ও পটুয়াখালী জেলা প্রতিষ্ঠার পর স্বাধীনতার পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে জেলার সংখ্যা বেড়ে ১৯টিতে দাঁড়ায়।
মহকুমা থেকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তর:
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালে জামালপুরকে প্রথম মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সরকারের প্রশাসনিক সংস্কার কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন মহকুমাকে পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বর্তমান ৬৪ জেলার প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার নামকরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি অঞ্চলের নামের সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোথাও নদী ও খাল, কোথাও প্রাচীন জনপদ, আবার কোথাও রাজা-জমিদার, সুফি সাধক কিংবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতি জেলার নামের সঙ্গে মিশে আছে।
এসব নাম শুধু প্রশাসনিক পরিচয় বহন করে না, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক সংস্কৃতিরও পরিচয় তুলে ধরে।