অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ : Nov 6, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঐক্য ও নিজস্ব পথ অনুসন্ধানের দিন

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও বিভাজনের প্রেক্ষাপটে সিপাহি-জনতার ঐক্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথ অনুসন্ধানের সুযোগ পায়।


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। সিপাহি-জনতার ঐক্য এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিজের চলার পথ খুঁজে নেওয়ার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক।

‘৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার দিন’ শীর্ষক এক নিবন্ধে তিনি বলেন, নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই দেশে একদলীয় বাকশালি শাসন, দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি জাসদের সহিংস রাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

লেখকের মতে, এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনার ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয়েছিল, ৭ নভেম্বর এসে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।

তিনি উল্লেখ করেন, ৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা ও তৎকালীন সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফ, জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের এবং সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। তবে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমানই প্রধান ভূমিকায় চলে আসেন। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বাইরে চলে যান।

ড. মারুফ মল্লিকের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক বিভাজন ও সংকটের মধ্যে জাতি যখন বিপর্যস্ত, তখন ঐক্যের আহ্বান নিয়ে সামনে আসেন জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের আগে থেকেই আস্থা ও জনপ্রিয়তা ছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও জাসদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নিবন্ধে বলা হয়, ওই সময় জাসদের এককভাবে অভ্যুত্থান সংগঠিত করার সক্ষমতা ছিল না। কর্নেল আবু তাহের ও জাসদ জিয়াউর রহমানকে সামনে রেখে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছিলেন বলে লেখকের বিশ্লেষণ। তবে শেষ পর্যন্ত সিপাহি-জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমানের হাতেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার কাছে কর্নেল তাহেরের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে জাসদের সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়।

লেখকের মতে, পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ ছিল জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তিনি বাকশালের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে উদার বাজার অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনীতির দ্বার উন্মুক্ত করেন।

নিবন্ধে আরও বলা হয়, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। এসব সংস্থার মাধ্যমে দেশে উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ প্রবেশ করে এবং কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। একই সময়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমেরও বিকাশ ঘটে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর আগ্রহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান বহুদলীয় ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেন বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর শাসনামলে বাকশালে বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ নিজ নামে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়। অন্যান্য দলের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও রাজনীতিতে ফিরে আসে। লেখকের মতে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জাতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ড. মারুফ মল্লিক বলেন, জিয়াউর রহমানের রাজনীতিতে আবির্ভাবের সময় বিশ্বজুড়েই সামরিক অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেও সামরিক শাসকদের প্রভাব ছিল প্রবল।

এমন বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনী থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ এবং দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন বলে মনে করেন লেখক। তাঁর মতে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চার নতুন অধ্যায় শুরু হয় জিয়াউর রহমানের হাত ধরে।

নিবন্ধের শেষাংশে লেখক জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে থাকা জাতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছিলেন।

ড. মারুফ মল্লিকের মতে, স্বাধীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭১ সালের পর এই দিনেই দেশের মানুষ আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

লেখক: ড. মারুফ মল্লিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কিউ-ক্যাশে ডিজিটাল লেনদেন ব্যাহত, দ্রুত সেবা চালুর নির্দেশ

1

আবেদন গ্রহণে গড়িমসির অভিযোগ

2

সংসদ প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

3

ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীর খোঁজে ২০২৬’ বিজ্ঞান মেলায় নিবন্ধন শুরু

4

হাটহাজারীতে গোলা বিস্ফোরণে শহীদ দুই সেনাসদস্যের পরিবারকে প্র

5

শিশু-কিশোরদের বই পড়ার অভ্যাস গড়তে উদ্যোগের নির্দেশ প্রধানমন্

6

পিএসসির রংপুর আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধন

7

বিসিবিকে না জানিয়ে চীন সফর, ব্যাখ্যা দিলেন লিটন

8

শরিয়া বিতর্কের মধ্যেই পিতা-মাতার সম্পত্তি সুরক্ষায় বিল পাস

9

৮১ বছরে জাতিসংঘ: বিশ্বশান্তি ও মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর সংস

10

গণতন্ত্রে মত ও সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা জরুরি : আইনমন্ত্রী

11

হিমালয়ের বিপর্যয়, সমতলেরও শঙ্কা

12

কুমিল্লায় আ.লীগ নেতা স্বপন গ্রেপ্তার

13

টানেলে ১০ দিন পর জীবিত চীনা নাগরিক উদ্ধার

14

আসামে উচ্ছেদ অভিযানে বাস্তুচ্যুত হাজারো মুসলিম পরিবার, মসজিদ

15

জামায়াত লংমার্চ করে সমাজে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে: পানিস

16

৫৩ বছর দেশ শাসনকারীরা নতুন আশা দেখাতে পারবে না: চরমোনাই পীর

17

বুড়াবুড়ি আদর্শ কিন্ডারগার্টেনে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

18

রোববার জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ২৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

19

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে প্রস্তুত রাজশাহী, মাদ্র

20